কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬ এ ০১:৫২ PM

ধারাবাহিকভাবে রূপপুর এনপিপি

কন্টেন্ট: পাতা

সর্বপ্রথম ১৯৬১ সালে দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । সে সময় থেকে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও স্বাধীনতা পরবর্তী পর্যায়ে প্রকল্পটির একাধিক সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। প্রতিটি সমীক্ষায় প্রকল্পটির কারিগরি, অর্থনৈতিক ও আর্থিক যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয়। ১৯৬৩, ১৯৬৫ ও ১৯৭৯ সালে প্রকল্পটির প্রকল্প দলিল সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পূর্বে একাধিক দেশ প্ৰকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব প্রদান করলেও আর্থিক ও অন্যান্য জটিলতার কারণে এর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি ।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৭-৭৮ সালে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করা হয় এবং এর জন্য সরকার দেশের সম্পদের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ করে। উক্ত সমীক্ষায় প্রকল্পটির আর্থিক, অর্থনৈতিক ও কারিগরী দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়।

১৯৮০ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প দলিল সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয় । সে সময় সৌদি আরব ও ফ্রান্স থেকে প্রকল্পের অর্থসংস্থানের প্রচেষ্টা চালানো হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি । পরবর্তীতে ১৯৮৭-৮৮ সালে আরো একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করা হয় এবং তখন থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যাদি চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য সরকার প্রধানের সভাপতিত্বে ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন' শীর্ষক একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয় । ১৩ এপ্রিল, ১৯৯৪ তারিখ উক্ত কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যাদির মূল্যায়ন, সমাধানের উপায় নির্ধারণ ও এ বিষয়ে মূল কমিটির নিকট সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করার জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন উপ-কমিটি গঠন করা হয়। ০৭ মে ১৯৯৫ তারিখ ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন-কমিটির ২য় সভা তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সম্ভাব্য সরবরাহকারী ও অর্থায়নের সূত্র সমূহের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে প্রকল্পের জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর ও অর্থায়ন সম্বলিত এক বা একাধিক পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব প্রণয়ন ও সরকারের নিকট পেশ করার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়।

১৯৯৭-২০০০ খ্রি. সময়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন রূপপুরে একটি ৬০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। মানবসম্পদ উন্নয়নসহ কয়েকটি প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়। ২০০৫ সালে তৎকালীন সরকার চীনের সাথে একটি পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ২০১৫ সালের মধ্যে রূপপুরে প্রতিটি ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুই ইউনিট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব করেছিল। প্রস্তাবে একটি ইউনিটের জন্য ০.৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ১.২ বিলিয়ন ডলার এবং অন্য ইউনিটের জন্য ১.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২.০ বিলিয়ন ডলার খরচ প্রাক্কলন করা হয়। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, সি এস করিম, পারমাণবিক কর্মসূচিতে অগ্রসর হওয়ার জন্য সরকারের অনুমোদন পেতে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০০৮ সালে 'রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে অপরিহার্য কার্যাবলী সম্পাদন' শীর্ষক একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ১ জুলাই, ২০০৮ হতে ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ মেয়াদে উক্ত প্রকল্পের আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়।

পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচীর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ সরকার IAEA সহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে প্রয়োজনীয় Nuclear Safeguards, Nuclear Security এবং Nuclear Safety সংশ্লিষ্ট সকল International Agreements, Treaties এবং Conventions স্বাক্ষর করেছে। এসকল আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বাংলাদেশের দায়বদ্ধতা/প্রতিশ্রুতি শতভাগ প্রতিপালনের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কার্যাদি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহ সম্প্রসারণ এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং রাশান ফেডারেশন সরকার বিগত ২০১০ সালের ২১ মে একটি Framework Agreement এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সংক্রান্ত আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি (Inter-Governmental Agreement) (IGA) বিগত ২০১১ সালের ০২ নভেম্বর স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশান সরকারের পক্ষে রোসাটম এই IGA স্বাক্ষর করে ।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প (১ম পর্যায়) বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বিগত ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি তারিখে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই তারিখে ১১.৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আন্তঃরাষ্ট্রীয় ঋণচুক্তি (IGCA) রাশান ফেডারেশন সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ইআরডি এবং রাশান সরকারের পক্ষে রাশান অর্থ মন্ত্রণালয় এই IGCA স্বাক্ষর করে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন (১ম পর্যায়) প্রকল্পটি ২০১৩-২০১৭ সময়কালে সুষ্ঠুভাবে নির্ধারিত বরাদ্দের মধ্যেই বাস্তবায়ন করা হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে IGA এবং IGCA-এর আলোকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশান ফেডারেশনের JSC Atomstroyexport-এর মধ্যে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারিখে ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার চুক্তি মূল্যের General Contract for Construction of Rooppur NPP স্বাক্ষরিত হয়। উক্ত চুক্তির আওতায় রাশান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ২ ইউনিট বিশিষ্ট VVER-1200 টেকনোলজির মোট ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভৌত নির্মাণ কাজ সম্পাদন, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং ও ট্রায়াল অপারেশন পর্যন্ত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জনবলের সাথে যৌথভাবে রাশান জনবলের অংশগ্রহণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং ও রক্ষণাবেক্ষণে বাংলাদেশী জনবলের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রাথমিক পর্যায়ের (তিন বছর) জ্বালানি সরবরাহ করা হবে।

বর্তমানে ১ম ইউনিটের রিঅ্যাক্টর বিল্ডিংয়ের ভৌত নির্মাণ কাজ আনুমানিক ৯৮% এবং ২য় ইউনিটের রিঅ্যাক্টর বিল্ডিংয়ের ভৌত নির্মাণ কাজ আনুমানিক ৯৩% বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ম ইউনিটের Reactor Pressure Vessel ২০২১ সালের ১০ অক্টোবর এবং ২য় ইউনিটের Reactor Pressure Vessel ২০২২ সালের ১৯ অক্টোবর ডিজাইন পজিশনে স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১ম ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় সরবরাহ করা হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে প্রায় ৯.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলস্টোন অর্জিত হয়েছে।

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন